শিরোনাম
বৃহঃ. ফেব্রু ১৯, ২০২৬

নুসরাত হত্যায় ১৬ জনের ফাঁসির আদেশ: ইলিয়াস হোসাইনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়ে তোলপাড়, সর্বত্র পূন: তদন্তের দাবি

বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক: ২০১৯ সালের বহুল আলোচিত ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামিকে নিদোর্ষ দাবী করে এবং এই ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে দাবী করে করা সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি নিয়ে সারাদেশে তোলপাড় চলছে। ইতোমধ্যে প্রতিবেদনটি স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে এই ঘটনা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠেছে।

প্রতিবেদনে ইলিয়াস হোসাইন বলেছেন, ‘নাটকের শুরুটা হয় কথিত বোরকা কান্ড নিয়ে। বলা হয়েছিলো, ‘খুনিরা সেদিন যে বোরকা পড়ে নুসরাতের গাঁয়ে আগুন দিয়েছিলো, সেই বোরকাটি মাদ্রাসার পাশেরই একটি পুকুরে ফেলে রেখে গিয়েছিলো। পিবিআই ঘটনার প্রায় এক মাস পর সেই বোরকাটি পুকুর থেকে উদ্বার করে।‘ এটা ছিলো সাজানো নাটক। একেবারে নতুনের মত সেই বোরকাটি উদ্বারের একদিন আগেই পিবিআই কর্মকর্তা অজিত সেই পুকুরে নেমে বোরকাটি রেখে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর প্রতিবেদনে আরও বলেছেন, ‘এই অজিত ফেনীর সোনাগাজীতে বিভিন্ন মানুষকে নুসরাত হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বাণিজ্য করেছেন। এটা পিবিআইয়ের সাজানো নাটক। বরং যারা নাটকের বাঁধা হয়ে হত্যাকে আত্মহত্যা বলেছেন, তাদেরকেই আসামি করে পিবিআই মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন।‘ ইলিয়াস দাবী করেছেন, ‘এই ঘটনার সাথে স্বয়ং পিবিআই প্রধান বনজ কুমার জড়িত আছেন। মামলায় নিরীহ মানুষকে আসামি করার পর পিবিআই প্রধান বনজ কুমার আসামিদের জবানবন্দী নিয়ে কারসাজি করেছেন। আসামিদের ধরবার পর জবানবন্দী নেওয়ার আগেই বনজ কুমার ঢাকায় বসে সংবাদ সন্মেলনে ঘোষণা দিয়েছেন যে, আসামিরা সবাই ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীতে সব দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন।’

ইলিয়াস হোসাইনের প্রতিবেদনে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি পাঁচ মাসের অন্তসত্তা মনির স্বামী মনিকে নির্দোষ দাবী করে বলেছেন, ‘মনিকে ড্রিল মেশিন দিয়ে পেট ফুটো করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পুলিশ মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করেছেন।‘ অন্য আসামিদের স্বজনরাও আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে, ইলেকট্রিক শক দিয়ে জোরপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করার অভিযোগ করেছেন। এমনকি আসামিদের রিমান্ডে আরও নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে আবার কখনো ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে বনজ কুমার গং তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। মামলার আসামি রুহুল আমিনের কাছ থেকে ৪ কোটি টাকা ও  অপর আসামি কাউন্সিলর মাকসুদের কাছ থেকে  বনজ কুমার গং ৩৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ইলিয়াস হোসেন তাঁর প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন। রিমান্ডে থাকার সময় এবং তার আগে পরে পিবিআইকে দেওয়া টাকা উত্তোলনের নথিও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে আছে বলে ইলিয়াস হোসাইন তাঁর প্রতিবেদনে দাবী করেছেন। প্রতিবেদনের একটা অংশে কাউন্সিলর মাকসুদের ছেলে বলেছেন, ‘পিবিআইয়ের অফিসার শাহ আলম তাকে ফোন করে সরাসরি বলেছেন, তোর বাবাকে যদি রিমান্ড থেকে বাঁচাতে চাস তাহলে তুই ৪০ লক্ষ টাকা দিবি বনজ কুমার স্যারের জন্য। টাকা দিলে তোর বাবাকে রিমান্ডে নির্যাতন করবোনা, মামলা থেকেও বাদ দিবো।’  কাউন্সিলর মাকসুদের স্ত্রীও একই কথা বলেছেন।

এদিকে ফেনীর সোনাগাজীতে নুসরাত জাহান রাফির অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সর্বত্র পূন: তদন্তের দাবি ওঠেছে। দন্ডিতদের স্বজনরাও মামলাটি পুন:তদন্তের দাবী জানিয়েছেন।

শনিবার বিকালে পৌর শহরের একটি রেষ্টুরেন্টে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের পরিবার সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। এসময় সাংবাদিকদের সামনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আবসার উদ্দিনের স্ত্রী সুরাইয়া হোসেন। তিনি বলেন, নুসরাতের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বার্থান্বেষি মহলের প্রচোরণায় আমাদের স্বজনদের মিড়িয়া ট্রায়াল ও প্রকৃত সত্য ইচ্ছেকৃত গোপন করে ফাঁসানো হয়েছে। ফাঁসানোর জন্য সিসিটিভি ফুটেজ ও এসএমএস গায়েব করা হয়েছে। রিমান্ডে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন করে তাদের শিখানো মতো জবানবন্দি আদায়েরর পর নাটকের অবতারনা করে আমাদের নির্দোষ নিরাপরাধ স্বজনদের ফাঁসির দন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নুসরাত অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর থেকে আমাদের কাছে দেশ ও বিদেশ থেকে বহু সাংবাদিকসহ প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে মোবাইলে এবং সরাসরি ঘটনার বিষয়ে জানতে চেয়েছে। আমরা প্রকৃত সব সত্য তাদের অবহিত করেছি। কিন্তু কেউ আমাদের বক্তব্য প্রচার না করে একতরফা সংবাদ পরিবেশন করে। এ সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আমরা আপনাদের জানাতে চাই আমাদের হারানোর আর কিছু নেই। আমাদের প্রিয়জনেরা অন্ধকার সেলে ফাঁসির প্রহর গুনছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তাই সত্য বলা ছাড়া কোন উপায় নেই। স্বজনদের মিথ্যা ফাঁসির দন্ড থেকে রক্ষা করতে আমরা নিজেরাই চেষ্টা করছি। কেউ আমাদের ইন্ধন দিচ্ছে এ ধরনের কথাবার্তা যারা বলছে তারা সত্যকে ভয় পাচ্ছে। কারণ সত্য কখনো গোপন থাকেনা মহান সৃষ্টিকর্তা যেকোন উপায়ে সেটা প্রকাশ করাবে। আমরা আমাদের স্বজনদের মিথ্যার বেড়াজাল থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি তখনি নাটকবাজরা আমাদের হুমকি ধামকি দিয়ে কন্ঠরোধের চেষ্টা করছে। ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত স্বজনদের মতো আমাদেরকে মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। আমরা আবারও বলছি আমাদের স্বজনরা সম্পুন্ন নির্দোষ। তাদের নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায়ের পর তড়িগড়ি বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফাসির দন্ড প্রদান করা হয়েছে। আমরা চাই ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত হোক।

এসময় তারা বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিকট আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘তদন্ত সংস্থা পিবিআই প্রকৃত সত্য আড়াল করে মিথ্যা নাটক তৈরী করেছে। ভিকটিম পরিবার মানুষের আবেগের অপব্যবহার করে কোটিপতি হয়েছে। তারা ঘটনার প্রকৃত বিচার চাইনি, তারা চেয়েছে নিজেদের আখের গোছাতে। পিবিআই আমাদের স্বজনদের জান ও আমাদের সামান্য সস্পদ কেড়ে নিয়েছে। আমরা আমাদের স্বজনদের মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তির জন্য নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি প্রতিবাদ অব্যহত রাখবো।’

এ সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়ায় সাংবাদিক কবি কাইয়ুম আব্দুল্লাহ লিখেছেন, ‘অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে সাংবাদিক ইলিয়াসের অনুসন্ধান সত্য হলে এই নির্দোষ মানুষগুলোর শীঘ্রই মুক্তি পাওয়া উচিৎ। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে এই ভেবে যে, সরকার কীনা মানুষের কাছে শুধু শুধু ইলিয়াসকে ভুল প্রমাণের হীন উদ্দেশ্যে পুনঃ বিচার বিবেচনায় না গিয়ে এতগুলো প্রাণ বধে অটল থেকে যায়! কারণ এর আগেও অনেক বিচারিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পাশাপাশি দলীয় বিবেচনায় অনেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকেও মুক্ত করে দেয়ার নজির সরকারের রয়েছে। প্রতিবেদনটি নির্মাণে তথ্যের প্রয়োজনীয় প্রামাণিক উপস্থাপন এবং বিশ্বাসযাগ্য বিশ্লেষণ যে কাউকে অবাক করার মতো। আমাকেও কিছুটা হলে যে করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।’

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *