ঋদি হক: বাংলাদেশ-ভারত পণ্যপরিবহণে রেলপথ এবং জলপথের মধ্যে যে একটা প্রতিযোগিতা চলছে তা লক্ষ করা গেছে। এক কথায় রেলের পর এ বার জলপথে লেগেছে গতির হাওয়া। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত নৌ-বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। দু’ দেশের মধ্যে ১০টি জলপথ সচল রয়েছে। এর মধ্যে অসম ও ত্রিপুরার সঙ্গে ধুবড়ি, শিলঘাট, পান্ডু, করিমগঞ্জ, বদরপুর, আশুগঞ্জ-আগরতলা, দাউদকান্দি-সোনামুড়া।
এ ছাড়া বাংলাদেশের খাগড়াছড়ির রামগড়ে ফেণী নদীর ওপরে নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু । চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৯৬ কিলোমিটার। সেতুর কাজ সমাপ্ত হবে ২০২২ সাল নাগাদ। তখন ত্রিপুরা হবে উত্তরপূর্ব ভারতের সিংহদরজা। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কোনো পণ্যবাহী ট্রাক ত্রিপুরার মাটি স্পর্শ করবে মাত্র ৪ ঘণ্টায়। এই সাশ্রয়ী পণ্যপরিবহনের দ্বার উন্মুক্ত হলে উভয় দেশ বাণিজ্যিক ভাবে লাভবান হবে। গতি আসবে অর্থনীতিতে। শিল্পকারখানা গড়ে ওঠবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিবিজরিত ত্রিপুরায়।
সেতুর কথা
২০১৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় সেতুটির শিলান্যাস করেন। ৪১২ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৪.৮০ মিটার প্রস্থের আন্তর্জাতিক মানের সেতুটি নির্মাণে ভারত সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১১০ কোটি টাকা। ২০২০ সালের এপ্রিলে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে তা পিছিয়ে যায়। এখন আশা করা হচ্ছে, ২০২২ সালের আগে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে।
সরেজমিনে সেতু-এলাকা ঘুরে দেখা গেল, বাংলাদেশ প্রান্তে সেতুর ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও ত্রিপুরা প্রান্তে এখনও দু’টো পিলারের কাজ বাকি রয়েছে। এই কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর সংযোগ-সড়ক ও অন্যান্য পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ শেষ হতে আগামী বছর লেগে যেতে পারে। তবে বাংলাদেশ প্রান্তে সেতুর সংযোগ-সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে।
বাংলাদেশ প্রান্তে সংযোগ-সড়কের কাজ চলছে
বাংলাদেশ প্রান্তে রামগড় পৌরসভার মহামুনি ও সাব্রুমের আনন্দপাড়া এলাকার মানুষ যেন হাত ধরাধরি করে আগলে রেখেছে মৈত্রী সেতুকে। বাংলাদেশ প্রান্তে সেতুর সংযোগ-সড়কের পাশেই ১০ একর জমি অধিগ্রহণের ব্যবস্থা হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন তা স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার পরেই পরিকাঠামো নির্মাণে হাত লাগানোর কথা জানালেন বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কে এম আখতারুল ইসলাম।
জমি বুঝে পাওয়ার পর সেখানে শুরু করা হবে স্থলবন্দরের পরিকাঠামোর কাজ, যা সম্পন্ন হবে ২০২৩ সালের জুন মাসে। তবে সেতুর কাজ শেষ হয়ে যাবে তার আগেই। তখন দু’দেশের প্রশাসন মনে করলে সেতুটি চালু করে দেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আনুষাঙ্গিক আয়োজন হয়তো অস্থায়ী ভাবে হতে পারে বলে মত স্থানীয় প্রশাসনের।
জলপথে বাণিজ্য
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার বহু আগেই রামগড়-সাব্রুম স্থলবন্দর স্থাপনে উদ্যোগী হয়। সেই ভাবনা থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য ভারত সরকার ফেনী নদীর ওপর চার লেনের এই সড়ক-সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করে।
প্রসঙ্গত, চলতি অর্থ বছরে জলপথে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৩ হাজার ২৬২টি পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করেছে। যার মধ্যে মাত্র ৭০টি হচ্ছে ভারতের। বাকিগুলো বাংলাদেশের। বিআইডব্লিটিএ’র (BIWTA) তরফে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের পণ্যবাহী নৌযানের সংখ্যা বেশি। এ সব নৌযানে প্রায় ২৮ লাখ মেট্রিক টন পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। এ সবের মধ্যে রয়েছে সিমেন্টের কাঁচামাল ফ্লাইঅ্যাশ, পাথর, স্টিল গার্ডার, কনটেনার ইত্যাদি।
দিন দিন জলপথে পণ্যপরিবহনের পরিধি বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত নৌপ্রোটোকলের আওতায় ১০টি নৌরুট রয়েছে। বলতে গেলে ভারতের প্রান্তিক রাজ্য অর্থাৎ উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে জলপথে পণ্যপরিবাহিত হওয়ায় অর্থনীতির দুয়ার খুলে গিয়েছে।
দিল্লি, কলকাতা ও অন্যান্য স্থান থেকে পণ্যবাহী একটি ট্রাক ত্রিপুরা পৌঁছোতে যেখানে কমপক্ষে ১২ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে যায়, সেখানে ২০ গুণ বেশি পণ্য নিয়ে কলকতা থেকে একটি জাহাজ জলপথে মাত্র ৬ দিনে ত্রিপুরা পৌঁছে যাবে। এতে সময় ও অর্থ, দুইয়ের বিশাল সাশ্রয় হবে, যার সুবিধাভোগী হবেন প্রান্তিকরাজ্যবাসী।
সরেজমিনে মৈত্রী সেতু
মাথার ওপরে আশ্বিনের জ্বলন্ত সূর্য। রামগড়ের সদর রাস্তায় এসে মিশেছে সংযোগ-সড়ক। সংযোগ-সড়ক ধরে হেঁটে মূল সেতুতে উঠে দেখা গেল কয়েক জন শ্রমিক ওয়াকওয়ের কাজ করছেন। সেতুর প্রায় ৯০ শতাংশই বাংলাদেশ প্রান্তে। সেতুর তলা জলশূন্য। শুকনো জমিতে কাজ করছেন কৃষকরা।
ভারতের অংশের দু’টো পিলারের কাজ চলছে জোরকদমে। আন্তর্জাতিক সেতুর নির্মাণকাজের প্রহরায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। সেতু এলাকায় সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। সেতুর ওপরে এবং নীচে সামগ্রিক নির্মাণ কাজ করছেন ভারতীয় শ্রমিকেরা। বাংলাদেশ প্রান্তে সেতুর তলায় দু’ জন বসে কাজের তদারকি করছেন। অপর জন পে-লোডারে মাটি সরানোর কাজ পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রান্তে জায়গা বেশি। অপর প্রান্তে সাব্রুম। ভারতের প্রান্তে যে পিলারের কাজটি চলছে, তা খালের ওপরে। জানা গেল এটিই ফেণী নদী নামে পরিচিত। কিন্তু নদীর কোনো অস্তিত্ব এখানে মেলেনি। ভারত-প্রান্ত ঘেঁষে একটি নালার মতো কিছু একটা দেখা গেল দূর থেকে। আর গোটা এলাকা জুড়ে সবুজ ফসলের ক্ষেত।

